কখন যাবেন   |   কীভাবে যাবেন   |   কোথায় থাকবেন

সিকিম রাজ্যটার প্রতি বাঁকেই প্রকৃতিবেশ সাজগুজু করে থাকে। এলোমেলো ঝরনা, সবুজে ঢাকা উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি আর চোখ বুজলেই মেঘের ভেলায় ভেসে কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানিএই নিয়েই সিকিম সুন্দরী।

এই মায়াবি সিকিমের পশ্চিম পারে পাইন পাহাড়ের ঘেরাটোপে আছে এক মনভোলানো গ্রাম, নাম তার ওখরে। আদিগন্ত সবুজ বিছানো নিরিবিলি গ্রামে ঘুম ভাঙার হিমালয়ের অচিন পাখিরা। চার-পাঁচ দিনের ছুটি নিয়ে বেড়িয়ে আসুন এই মেঘ পাহাড়ের দেশে। সাধ আর সাধ্য দুই থাকবে সীমানার মধ্যে।

ওখরে গ্রামের রাস্তা

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে জিপ ছাড়বে। মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারিকে পিছনে রেখে প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ উজিয়ে ডিপ থামবে জোরথাং-এ। এখানে লাঞ্চ সেরে নিন। এরপর জোরথাং থেকে অন্য জিপ গাড়ি চলবে চড়াই পথে। গন্তব্য ওখরে। জোরথাং-র কাছে ত্রিবেনী সঙ্গমে রঙ্গিত নদীর স্বচ্ছ ঘন সবুজ জল মিশেছে তিস্তার জলে। এরপর পাহাড় কেটে তৈরি আঁকাবাঁকা মসৃণ পিচের রাস্তা ধরে পথ চলা। সঙ্গী রঙ্গিত নদী আবার কখন রাম্মাম নদী।রাস্তার দু’ধারে চেনা অচেনা সবুজের সমারোহ, পাহাড়িয়া স্নিগ্ধ হিমেল বাতাসে ভেসে আসা বুনো ফুলের গন্ধে শরীর মনের ক্লান্তি দুর। ভাগ্য সহায় থাকলে যাত্রা পথেই দেখা মিলতে পারে রেডপান্ডার, আর আছে অগুনতি রং-বেরঙের পাখিহিমালয়া কুক্কু, সোনালি টুনটুনি, হিমালয়ান বারকেট, রেড লিউথিক্স, ইওমো বিল্ড ব্লু ম্যাগপাই আরও কত কি! ষোলোআনা ভ্রমণের বারোআনাই উসুল যাত্রাপথে। এরকম মন ভোলানো প্রকৃতিকে সঙ্দগি করে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পাহাড়ি পথ উজিয়ে গাড়ি থামবে ওখরে গ্রামে। গ্রামে গুটিকয়েক হোমস্টে ও কটেজের ব্যবস্থা আছে, দেখাশোনার দায়িত্বে গ্রামের মানুষেরাই। পাহাড়িয়া আতিথেয়তা নিঃসন্দেহে মন কাড়বে।

ওখরে গ্রামের চারপাশ উঁচু উঁচু সবুজ পাহাড়ে ঘেরা। সূর্যিমামার পরশ লাগে একটু দেরিতে। শীতের সকালে যদি কাকভোরে ঘুম ভাঙে, কটেজের জানলা দিয়ে একবারটি চোখ রাখুন পাহাড়ের ঢালে। দেখবেন ঘন কুয়াশায় ভিজে পাইন-দেবদারুর শরীর বেয়ে যেন মদিরা ঝরছে টুপটুপ শব্দে। বর্ষার সঙ্গে আবার এই বনপাহাড়ের এক অর্মোঘ সম্পর্ক! বৃষ্টিভেজা সপসপে চিরসবুজ বনানী তখন যেন ঝিম ধরা নেশায় বুঁদ হয়ে আছে পাহাড়ের ঢালে থোকা থোকা মেঘ ভেসে চলেছে আপন খেয়ালে। এখানে মেঘ সত্যি গাভীর মতো চলে। আর আলসেমি জড়ানো সকালে যদি ঘুম ভাঙে একটু দেরিতে তবেইবা মন্দকি! সহজ সরল পাহাড়িয়া হোমস্টের মালকিনের উষ্ণ আতিথেয়তায় মন ভিজবে। তবে আমি বলিকি একটা দিন নাহয় আসলেমি ঝেরে একটু জলদি উঠুন, ভোরের ওখরে সুন্দীর পরশ পেতে। ধোঁয়া ওঠা কফিতে গা ভিজিয়ে ক্যামেরা কাঁধে বেড়িয়ে পড়ুন ওখরের রাস্তায়। ভোরের সূর্য তখন কালিম্পং পাহাড়ের পিছন থেকে ছাড়া পেয়ে দার্জালিং আর নামচির মাঝ বরাবর রাম্মাম নদীর গিরিখাত বেয়ে মেঘ ঠেলে ঠেলে এগিয়ে আসছে। সমস্ত উপত্যকাজুড়ে তখন আলো-আঁধারির মায়াখেলা চলছে। পিচের রাস্তাটা এঁকেবেঁকে নেমে গিয়েছে নীচের উপত্যকায়। একরাশ পাহাড়িয়া দামাল ছেলেপুলে স্কুল ব্যাগ পিঠে চড়িয়ে পাহাড় ভাঙছে, মার্চ-এপ্রিলে রাস্তার দু’ধারে দেখা যায় বাহারি রডোডেনড্রন আর অর্কিডের বন্যা।

রডোডেনড্রন

বছরখানেক হল টুরিস্টদের যাতায়াত শুরু হওয়ার পর ওখরে যেন একটু নড়েচড়ে বসেছে। চড়াই-উত্‌রাই পথের দু’পাশে গ্রাম আর জঙ্গলের মিশেল। সেখানে হরেক প্রজাতির হিমালয়ান পাখি আর প্রজিপতিদের আনাগোনা, গ্রামের হাসিখুশি মহিলারা পিঠে টুকরি বেঁধে চাষে চলেছে, ঝুম চাষ। প্রধান ফসল আলু। তবে টুকরো জমিতে বাঁধাকপি ও অন্যান্য শাকসবজিরও চাষ চলে।

ওখরের ঠিক আলটোদিকে রাম্মাম নদীর ওপারে ছোট জনপদ রিমবিচ। ঢালের মাথার কাছে মেঘমা আর আরও ডাইনে যে বিরাট উঁচু পাহাড়ের চূড়োটি, ওটাই হল পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে উঁচু বিন্দু সান্দাকফু।

হোমস্টেতে ফিরে নাস্তা সেরে এবার একটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।

প্রায় ৭ কিমি দূরে আলেদারা ভিউ পয়েন্ট থেকে নীচের উপত্যকা পুরোটা দেখা যায়। ওপরের পাহাড়ে বৌদ্ধদের বাস আর নীচের প্রজাপতি আকারের উপত্যকায় হিন্দুদের। পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে কেটে চলছে জুম চাষ। পূব-পশ্চিম পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাঠের বাড়িগুলো, খেলনার মতো।

ওখরে গ্রাম

১২ কিমি দূরে আনদেন ওলাং মনাস্ট্রি শাকমূনির বুদ্ধের অধিষ্ঠান। চারপাশে বৌদ্ধদের পাঁচরঙের প্রার্থনা পতাকা পত পত করে উড়ছে, বৌদ্ধমতে নীল হল আকাশ, সাদা-হাওয়া, লাল-অগ্নী, সবুজ-জল, হলুদ মাটিকে নির্দেশ করে। মঠের ছোট ছোট লামারা ব্যস্ত প্রার্থনায়, মঠের বৃহদাকার কাসর ও বিউগলের শব্দ নির্জন পাহাড়ে প্রতিদ্ভনিত হয়ে সৃষ্টি করেছে এক মায়াবী শব্দজালা।

প্রায় ২০ কিমি উতরাই পথ শেষে দেখতে পাবেন অতি সুন্দর সাইবাবার মন্দির। যাত্রাপথে দেখে নিতে পারেন দেবী ফলস, কিতান জলপ্রপাত, দোদোক হ্যালিপ্যাড ও আরও কিছু ভিউপয়েন্ট।

ওখরের অবস্থান পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে, তাই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে হলে যেতে হবে হিলে হয়ে বার্সে নয়ত সরাসরি পাহাড়ের মাথায় উঠে লামাসি। প্রথম পথ নির্বাচনই শ্রেয় কারণ উপরি হিসাব এই পথে দেখা মিলবে এক আদিম বনানীর। পরদিন ব্রেকফাস্ট সেরে ভোর ভোর রওনা দিন। ওখরে থেকে ১০ কিমি দূরে গাড়ি থামবে হিলেতে। হিলে থেকেই বার্সে রডোডেনড্রন স্যাংচুয়ারির ট্রেকিং শুরু। দিনের দিনেই বার্সে ট্রেকিং সেরে নেওয়া যায়। তবে কাঞ্চজঙ্ঘার বুকে প্রভাতের রঙের খেলা দেখতে হলে এক রাত বার্সেতে থাকতে হবে।

ওখরে মনাস্ট্রি

উত্তরে কাঞ্চনজঙ্ঘা বায়োস্ফিয়ার এবং দক্ষিণে সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের সংযোগকারী এই স্যাংচুয়ারি প্রায় ১০৪ বর্গকিমি স্থান জুড়ে বিস্তৃত, উচ্চতা গড়ে ১০,০০০ কিমি। ট্রেকিং পথের দু’ধারে দেখা যাবে ম্যাগনোলিয়া প্রিমুলার হিরেক প্রজাতি আর রাস্তার দু’পাশে পাথরের ফাঁক দিয়ে জংলি স্ট্রবেরির উঁকি ঝুঁকি। আবার কখনওবা ঘন বাঁশবন। এই বাঁশের জঙ্গলেই বিপন্ন রেডপান্ডাদের। রেডপান্ডা ছাড়াও কালো ভাল্লুক, লেপার্ড ও উড়ন্ত কাঠবিড়ালীর মতো স্তন্যপায়ীদের ঘর এই অরণ্যে। গা ছমছমে জঙ্গলে শনশন হাওয়া ভেসে আসবে আগুনতি পাখিদের কলকাকলি। কখনওবা পাইন, ফার, ওকের ঘন জঙ্গল, যেন আকাশ ছুঁয়েছে। আলো আঁধারি শ্যাওলা জড়ানো গাছের কান্ড, শ্যাওলা চুঁইয়ে শিশির বিন্দু টুপটাপ, শুকনো পাতা বিছানো নরম মাটির রাস্তা, বিচিত্ররঙা মাকড়সার ডালসব মিলিয়ে যেন এক আদিম বিচিত্র জঙ্গল পথে হেঁটে চলা। মার্চ-এপ্রিলে এই বন বিভিন্ন প্রজাতির রডোডেনড্রন ফুলে ঢেকে যায়। লাস্যে লাবণ্যে বার্সের তখন সে এক কুহকিনী রূপ।

এভাবে ৪ কিমি চড়াই-উত্‌ড়াই শেষ হবে বার্সের টিলা। এখান থেকে দিগন্তরেখার চোখ তুললে ধরা দেবে সনার্ষদ কাঞ্চনজঙ্ঘা। বরফ শৃঙ্গে রোদ পিছলে সৃষ্টি করছে সাদা মায়ায়ালএ এক অকার্থিব অনুভূতি।

সন্ধ্যায় কটেজে ফিরে বারান্দা থেকে উপভোগ করুন চন্দ্রালোকিত পাহাড়ে আধো নীলিমার হাতছানি। চোখের সীমনায় পাহাড়ের গাঢ় সবুজ গালিচার ঢালে হাজারো বাতির মিটিমিটি। কখনও বা থোকা থোকা সাদা মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে পাহাড়টাকে।

পরদিন বাড়ি ফেরা। ফিরতি পথে রাম্মাম-রঙ্গিতকে পাশে রেখে পাতদন্ডী বেয়ে উত্‌ড়াই নামা, একরাশ সুখস্বৃতিতে ভিজতে ভিজতে। ওখরে বড়ই সুখের নিশ্চন্ত আশ্রয়। মেঘ কুয়াশায় গা ভাসিয়ে এই ক’টাদিন শুধু ছুটি আর ছুটি, সঙ্গি কেবল রিমঝিম মেঘ-পাহাড়।


 
কীভাবে যাবেন
ওখরে যাবার সরাসরি কোনও গাড়ি নেই, শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার জিপে জোরথাং। জোরথাং থেকে শেয়ারে জিপ যাচ্ছে ওখারে পর্যন্ত। ভাড়া যথাক্রমে ১৫০ টাকা ও ১০০ টাকা। এই ১৩০ কিমি যাত্রাপথের সময় লাগবে সাড়ে ৪ ঘণ্টা থেকে ৫ ঘণ্টা। তবে জোরথাং থেকে ওখরে যাবার শেষ জিপ ছাড়ে দুপুর দু’টোয়। গাড়ি রিজার্ভ করেও সরাসরি ওখরে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে খরচ পরবে প্রায় ৫০০০ টাকা। গাড়ির জন্য এ স্থানীয় দ্রষ্টব্য স্থানগুলো দেখতে যোগাযোগ করতে পারেন দাবা শেরপাকে। যোগাযোগ:০৯৭৭৫৯৭৭৯৩৯।

কোথায় থাকবেন
কয়েক বছর ধরে ওখরে গ্রাম টুরিস্টদের নজরে আসায় এই গ্রামে গুটি কয়েক কটেজ ও হোমস্টের (ম্যাগনোলিয়া) ব্যবস্থা আছে। প্রতিদিনের থাকা খাওয়ার খরচ পড়বে জনপ্রতি ৭৫০ টাকা। যোগাযোগ: ০৯৬০৯৮৫৬৪১৪।

কখন যাবেন
বছরের যে কোনও সময় ওখরে যাওয়া যায়। তবে বার্সে থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার নয়নাভিরাম রূপ দেখবার সঠিক সময় অক্টোবর থেকে জানুয়ারি আর রডোডেনড্রন ফোঁটার সময় মধ্য মার্চ থেকে মধ্য এপ্রিল। তবে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মিলবে সারা বছর ধরেই।

Posted on 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *